প্রকাশ: ২১ মে ২০২১, ১৫:০
ঈদের আগে এসেছি ধান কাটার কাজ করতে। কয়েকদিন ভালই কাজ করতে করেছি। কিন্তু এখন বেকার বসে আছি। পকেটের টাকা খরচ করে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। দিনের পর দিন অপেক্ষা করছি, কেউ এসে বলবে আমার শ্রমিক লাগবে। কথাগুলো বলছিলেন, কুড়িগ্রামের রৌমারি থেকে আসা পঞ্চাশোর্ধ শ্রমিক আব্দুল বারেক মিয়া।
বৃহস্পতিবার সকালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া শ্রমহাটে কথা হয় আব্দুল বারেকসহ কয়েকজনের সাথে। সংবাদকর্মীর পরিচয় পেয়ে তারা সবাই তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে মিলিত হন। কার আগে কে বলবেন তার কষ্ট, যাতনার কথা এ নিয়ে হৈচৈ বেঁধে যায়।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহী, নাটোর, নওগা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, পঞ্চগড়সহ কয়েকটি জেলার শ্রমিকরা এখানে আসেন ধান কাঁটার মওসুমে। শ্রমিকরাও প্রতি বছর এই সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। এই অঞ্চলে ধান কেঁটে তারা বাড়তি মজুরী পান। এতে আয় হয় তুলনামুলক বেশি। তাই তারা এই অঞ্চলেই আসতেই বেশি উৎসাহবোধ করেন। এখানকার করটিয়া বাজার, স্কুল, এইচএম ইনস্টিটিউশন কলেজ, মাদ্রাসা ও আশেপাশের মাঠেই তারা অবস্থান নিয়ে থাকেন। রাত্রিও যাপন করেন এসব প্রতিষ্ঠানের বারান্দা বা মাঠে।
চারদিকে ঘুরে দেখা যায় অসংখ্য শ্রমিক খোঁলা মাঠে গাঁমছা বিছিয়ে শুয়ে আছে। কেউবা বসে আবার কেউ দাড়িয়ে থেকে একে অপরের সাথে কথা বলছেন। দুই-একজন কৃষককে দেখা যায় শ্রমিকের সাথে কাজের মজুরী নিয়ে দর-দাম করতে। দিনাজপুর থেকে আসা শ্রমিক ইসমাইল হোসেন, রাজশাহী থেকে আসা গোলাম আলিসহ আরও কয়েকজন জানান, গত বছর তারা এই সময়ে ধান কেটে প্রতিদিন ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা রোজগার করত।
এবার সেখানে তারা পাচ্ছেন ৪শ’ থেকে ৪৫০ টাকা। ঈদের সময় বসে থাকতে হয়েছে। তাই খুব একটা কাজ করতে পারেননি তারা। এর মধ্যে অনেক কৃষক যান্ত্রিকভাবে (হার্ভেস্টার) ধান কেঁটেছেন। তাই তাদের শ্রমিকের প্রয়োজন পড়েছে কম। সব মিলিয়ে আমাদের বাড়ি ফেরার মতো টাকাও জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে এখানে প্রায়ই কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক এসে আমাদের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। না দিলে মারধর করে। এদিকে ধান কাঁটার মৌসুমও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কি করবো বুঝতে পারছি না।
রফিক নামে একজন শ্রমিক বলেন, লকডাউনের কারনে গাড়ি বন্ধ থাকায় তিনশ’ টাকার ভাড়া নয়শ’ টাকা দিয়ে আসতে হয়েছে। যা কিছু আয় করেছিলাম সেটাও পাঠিয়ে দিয়েছি ঋণের টাকা পরিশোধ করতে এবং বাড়ির জন্য কেনা-কাটা করতে। এখনো লকডাউন চলছে অথচ ফেরার মতো টাকাও সাথে নেই।
সাজু নামে অপরএকজন বলেন, কাজ থাকলে কৃষকের বাড়িতে ডাল-পান্তা ভাত কপালে জোটে। কাজ না থাকলে এখানে এসে দিনের পর দিন কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ে রুটি কলা ছাড়া আমাদের ভাগ্যে কোন খাবার জোটেনা।
স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য আজমেরি রহমান মুন্নি বলেন, শ্রমিকদের এই হাটটি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই হাটটি। তারা ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত্রি যাপন করেন। অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করেন। প্রযুক্তির ব্যবহারের সাথে সাথে তাদের কাজের পরিধি কমে যাচ্ছে। আমি চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে তাদের জন্য কিছু করনীয় থাকলে ব্যবস্থা করবো।
করটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খালিকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, প্রতি বছর এই মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা এসে এখানে জড়ো হয়। তারা জেলার বিভিন্ন স্থানে কাজ করে আবার এখানে এসেই রাত্রি যাপন করেন। কিন্তু কিছু নেশাগ্রস্থ্য, উচ্ছৃঙ্খল ছেলেরা এসে শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। মারধর করে আহত করার ঘটনাও ঘটে। আমি শ্রমিকদের বলেছি, তারা যেন আমার পরিষদে এসে টাকা জমা দিয়ে যায়। এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় তারা তাদের টাকা বুঁঝে নিবে। এর জন্য আমার পরিষদকে বলে দেওয়া আছে। কিন্তু শ্রমিকরা এতে আগ্রহ দেখায় না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো শ্রমিককে রাত জেগে পাহাড়া দিয়ে রাখার ব্যবস্থা আমার পরিষদের নেই।
সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান আনসারী বলেন, এখানে যারা কাজ করতে আসেন তারা খুবই হতদরিদ্র। পেটের দায়ে পরিবার-পরিজনের মুখে খাবার তুলে দিতে তারা এখানে এসে শরীরের ঘাম ঝড়ায়। অথচ স্থানীয় হৃদয়, শামিমসহ তাদের কয়েকজনের একটি সংঘবদ্ধ দল শ্রমিকদের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। আমি বিষয়টি এসপিসহ বাসাইল ও সদরের ওসিকে জানিয়েছি। তারা যদি ব্যবস্থা না নেয় আমি কি করতে পারি বলেন ?
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোশারফ হোসেন বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান আমাকে বিষয়টি বলেছেন। যেহেতেু ঘটনাটি করটিয়ায় এবং স্থানটি আমার এলাকায় পড়েছে তাই আমি তাকে বলেছি সেখানে টহলের ব্যবস্থা করবো। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা পার্শ্ববর্তী বাসাইল থানার করাতিপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাদের বিরুদ্ধে বাসাইল থানাকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আমি সহযোগিতা করবো।
#ইনিউজ৭১/জিয়া/২০২১