প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ২:২৩
ঠাকুরগাঁও সদরে গৃহ ও ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্পের ৪২টি ঘর বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী খোকনের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে খোকেন জানান, তার বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানো হচ্ছে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
জানা যায়,আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় চতুর্থ পর্যায়ের সদরের জগন্নাথপুর ইউনিয়নে কালিতলা বাজারে পাশে নির্মিত হয় ৫৪টি আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর। পরে পর্যায়ক্রমে ১২টি ঘর ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া হলেও পড়ে থাকে ৪২টি ঘর। নিয়মনুযায়ী এ সব ঘর দেখাশোনা ও রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমিসহকারীর। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়ে যেনো ঘরের মালিক বনে যায় খোকেন।
প্রকৃত ভূমিহীন ও সরকারি নিয়ম তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঘরে উঠিয়ে দেন তিনি। তার এই কাজে সহযোগিতা করেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস সহকারি মোঃ হালিম ও স্থানীয় সামাদ নামে এক ব্যক্তি।
খোকেনের মাধ্যমে ঘরে উঠেন শাহানাজ পারভীন ও তার পরিবার। শাহানাজ বলেন, খোকন স্যার আমাদের ঘরে তুলে দিয়েছেন। আমাদের নামে ঘর বরাদ্দ হয়নি বলে জানতে পেরেছি।
দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা ঠরিজা বেগম। তিনি এবং তার স্বামী আখতারুল ইসলাম সহ চট্টগ্রামে এর আগে থাকতেন কিন্তু সামাদের মাধ্যমে পরিচয় হয়ে তিনি ঠাকুরগাঁও চলে আসেন গুচ্ছগ্রামে। গত একমাস আগে একদিন ভোর রাত্রে তাদেরকে এই গুচ্ছগ্রামে তুলে দেয় এবং ওই রুমে যে ব্যক্তি ছিলেন তাকে ভোর রাত্রে সামাদ এবং তার সহযোগীরা বের করে দেয়।
ঠরিজা বেগম বলেন, গত একমাস আগে রাতের আঁধারে তারা এই আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরে ওঠেন। ঘরে উঠিয়ে দেন খোকনের সহযোগী সামাদ। তিনি আরো বলেন,আগে আমরা চট্টগ্রামে থাকতাম আমার স্বামীকে ঘর দেওয়ার কথা বলে খোকন ও সামাদ এখানে নিয়ে আসে। এখন গুচ্ছ গ্রামে বসবাস করছি।
ওই গুচ্ছগ্রামে পাশের এলাকার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, সামাদ আমার কাছে ১০ হাজার টাকা চাইছিল আমি টাকা দিতে পারি নাই বলে ঘর পাইনি। যারা টাকা দিচ্ছে তারাই ঘর পাচ্ছে।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা চন্দনা বলেন, সামাদ আমার কাছে টাকা চাইতে আসছিল। আমার কাছে টাকা নাই। আমি দিতে পারিনি।পরে সামাদ আমার ঘরে তালা লাগিয়ে দেই। পরে আমার কাছ থেকে ১০০০ টাকা নিয়ে গেছে। এই টাকা টা সে নাকি খোকেন কে দিবে। খোকেন নাকি সরাসরি টাকা চায় না।
এই আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দীন রহমান বলেন, আমি যুবলীগের সেক্রেটারি এবং যুবলীগের নেতাদের নতুন ঘর পাইয়ে দেওয়ার কথা বলছিলাম। তারা আমাকে ঘরে উঠিয়ে দিয়েছে। ঘরের কোন কাগজ আমার কাছে নেই।
জগনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ সাইদুল বলেন, মানিক মিয়া নামের এক জন এই গুচ্ছগ্রাম একটি ঘর পায়। তিনি এই ঘরে কখনোই থাকেন না। এই ঘরটি তিনি বিক্রি করবেন। বেশ কিছু মানুষের কাছে বলেছেন। আমার কাছে এসেছিল ঘরটির ন্যায্য দাম পাইলে তিনি বিক্রি করে দিবেন।
গুচ্ছগ্রামের বাসবাস কারী ত্রিপলী রানী বলেন, রাত তখন দুইটা, ঝিরিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে। রাত দুইটার দিকে বৃষ্টির মধ্যে ঘরের দরজায় কে যেন কড়া নাড়লো। বের হয়েই ডাক শুনি সামাদ । তিনি বলেন এই বৃষ্টির মধ্যেই এই মুহূর্তে ঘর থেকে বের হয়ে যাও। তৎক্ষণাৎ সামাদ তার লোকজনকে নিয়ে সেই বৃদ্ধ মহিলা এবং তার স্বামীকে ঘর থেকে বের করে দেয়। বৃষ্টির মধ্যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের যত জিনিস ছিল সব কিছু বের করে দেয় সামাদ ও তার দলবদের লোকজন। কান্না করতে করতেই এভাবেই বলতেছিলেন তিনি। বর্তমানে তারা গুপ্ত গ্রামের একটি রুমের বারান্দায় বসবাস করতেছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো.দুলাল হোসেন বলেন, এই গুচ্ছ গ্রামে ৫৪টি ঘর আছে। তার মধ্যে ১০ থেকে ১২ টা ঘর ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪২টি ঘর খোকন, সামাদ ও হালিমের নেতৃত্বে বিক্রি করা হচ্ছে। তারা যেন ঘরগুলোর মালিক। নিজেদের খেয়াল খুশিমতো সরকারি এই ঘরগুলো বিক্রি করে দিয়েছে তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জগন্নাথপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী খোকেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানো হচ্ছে। এটা অনেকদিন আগের কথা। এ বিষয়ে অনেক কিছু হয়েছে। এখন আমি কিছু বলতে চাই না।
ভূমি অফিস সহকারী হালিমও বলেন,ঘর বিক্রির সঙ্গে জড়িত নয় তিনি।
ঘর বিক্রির ঘটনাটি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে জানিনা এবং আমাকে কেউ এ বিষয়ে বলেনি। যেহেতু আপনি (প্রতিবেদক) বলেছেন এটি খতিয়ে দেখব।