প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৪, ২১:১৯
সরকারি চাকরি, যাকে আমরা ‘সোনার হরিণ’ বলে থাকি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শিক্ষিত তরুণ- সমাজের বিপরীতে চাকরিক্ষেত্রে প্রবেশের হার তুলনামূলক অনেক কম হওয়ায় সরকারি চাকরি পাওয়া সত্যিই কঠিন। তাই বলে কি কেউ সরকারি চাকরি পাচ্ছে না? অবশ্যই পাচ্ছে। তবে তারা মেধায় পাচ্ছে নাকি ভিন্ন কোনো উপায়ে? সবারই মনের ভেতর নানান প্রশ্ন।
ঘুষ ছাড়া নাকি সরকারি চাকরিই মেলে না। এজন্য থাকতে হয় মামা-খালুসহ রাজনৈতিক নেতাদের দয়াদাক্ষিণ্য। আসলেই কি বর্তমান বাস্তবতা এমন? সরকারি চাকরি পেতে আসলেই কি ঘুষ লাগে? সরকারি বা পুলিশের চাকরি পেতে ঘুষ লাগে কি না, কোন এক সময় শুনা যেত পুলিশের চাকরি পেতে অনেক টাকা গুনতে হয়। রাজমিস্ত্রি করে সংসার চালাই।
নিজের যা রোজগার হয় তার সবটাই ব্যয় হয় সংসারে। চারটি ছেলে- মেয়ে আমার।ছেলের পুলিশের চাকরির জন্যে এতো টাকা কই পাব। এমন কঠিন চিন্তা এসে মাথার উপর ভর করে। কিন্তু কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই আমার ছেলে পুলিশের চাকরি পাওয়াতে আমার আগের সমস্ত চিন্তা ভাবনা পাল্টে গেলো! টাকা তদবির ছাড়া ছেলের চাকরি হলো মাথার উপর থেকে যেন চিন্তার একটা বুঝাই আর নাই- আজ দুপুরে এমন করে মৃদু মৃদু কন্ঠে বলছিলেন,
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের চাকরি পাওয়া আব্দুর রাজ্জাকের পিতা।সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ ইউনিয়নের মনিরবাগ গ্রামের আব্দুর রাকিব। গত ১৩ তারিখ পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পায় আব্দুর রাকিবের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক। এসময় তিনি দোয়া করেন কৃতজ্ঞতা জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেনসহ পুলিশের সকল
কর্মকর্তাদেরকে। কথা হয় আব্দুর রাজ্জাকের মা মাসুমা বেগম তিনি বলেন, আমার ছেলে আব্দুর রাজ্জাক তাকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি।শত কষ্টের মাঝেও মেধার সাথে লেখাপড়া করিয়েছি। আমার কষ্ট আর তার মেধা আজ এ সফলতা এনেছে।আমার ছেলের মেধা যাচাই-বাছাই করে। পুলিশ সুপার আমার ছেলেকে কনস্টেবল এ চাকরি দিয়েছে। আমি ওনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তিনি আরও বলেন,আমার ছেলের চাকরির আবেদন অনলাইনে প্রেরণ বাবদ
খরচ হয়েছে ১২০ টাকা।এছাড়া আমার কোনো টাকা দিতে হয় না।আশা করি ভবিষ্যতে আমার ছেলে যেন আরো বড় হতে পারে। পুলিশ সুপার যেন দোয়া করে আমিও দোয়া করি। এমন কথা যেন ৭১ জন অভিভাবদের হৃদয়ের কথা। এদিকে জানাযায়,গত বুধবার (১৩ মার্চ) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বাংলাদেশ পুলিশে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নিয়োগ জানুয়ারি ২০২৪ এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এ জেলায় শতভাগ মেধা, যোগ্যতার
ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত নিয়োগ কার্যক্রমের সব গুলো ধাপ স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করে বাংলাদেশ পুলিশে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৭১ জন চাকরি প্রার্থী চাকরি পেয়েছেন। এদের মধ্যে ৬০ জন পুরুষ আর ১১ জন নারী। সরাইল উপজেলার পাঁচজনের চাকরি হয়েছে।‘সেবার ব্রতে চাকরি’ এই স্লোগানে পুলিশের ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের চাকরি পেয়েছেন ৭১ জন ছেলে-মেয়ে। চাকরি পেতে অনলাইন আবেদন খরচ বাবদ জনপ্রতি খরচ হয়েছে ১২০
টাকা।ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনস্ ড্রিল শেড নতুন চাকরি পাওয়া ছেলে- মেয়েদের মনস্তাত্ত্বিক ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন বিপিএম।এ সময় নির্বাচিত ৬০ জন ছেলে ও ১১ জন মেয়ে রিক্রুটকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন পুলিশ সুপারসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ নিয়োগ বোর্ডের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শনিবার দুপুরে দেখা হয় পুলিশ কনস্টেবল আব্দুর রাজ্জাক (১৭)। রাজ্জাক উপজেলার মনিরবাগ গ্রামের আব্দুর রাকিবের বড় ছেলে। তার পিতা আব্দুর রাকিব দিনমজুর রাজমিস্ত্রীর কাজকরেন। মা ঘরে সেলাইয়ের কাজ করে। রাজ্জাক তারা দুই ভাই দুই বোন। বাকি ভাই বোনেরা বিভিন্ন শ্রেণিতে লেখাপড়া করছেন। রাজ্জাকদের কোন জায়গা সম্পত্তি নেই। তারা ভূমিহিনও গৃহহীন। তারা সবাই
থাকেন নানার আশ্রয়ে সরাইল উপজেলার মনিরবাগ গ্রামের অসুস্থ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের হাবিলদার উসমান গণির বাড়িতে। নানার বাড়ি থেকে রাজ্জাক এসএসসি পরীক্ষা-২০২১ সালে সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করেন। পরে এইচএসসি পরীক্ষায়-২০২৩ সালে সরাইল সরকারি কলেজ থেকে সফলতার সাথে পাশ করেন।
রাজ্জাকের নানা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের হাবিলদার উসমান গণি অসুস্থ বিছানায় শুয়ে। নাতির পুলিশের চাকরি হওয়ার কথা শুনে বলেন, শেষ বয়সে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছি। চোখের পানি ছেড়ে বলে।আজ মনটা অনেক ভালো লাগতেছে বিনা পয়সায় মেধা ও যোগ্যতায় আমার নাতির চাকরি হয়েছে "আলহামদুলিল্লাহ"আমি সবার জন্য দোয়া করি। সদ্য পুলিশের কনস্টেবল আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি একজন রাজমিস্ত্রি ছেলে। নানার বাড়িতে আমরা থাকি।
সংসারের দুঃখ কষ্ট নিয়ে আমি বড় হয়েছি এবং লেখা পড়া করতেছি। এর মধ্যে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরির আবেদন অনলাইনে করি।কোনদিনও ভাবি নাই আমার চাকরি এভাবে হবে। মা বলতেন বাবা তোর কপালে থাকলে চাকরি হবে। আজ সত্যিই মার কথা ও স্বপ্ন সত্য হয়েছে।টাকা ছাড়া তদবির ছাড়া মেধার ভিত্তিতে পুলিশ সুপার স্যারের শতভাগ স্বচ্ছতায় নিয়োগ পরীক্ষায়। আমার শত ভুল চিন্তাধারাকে মিথ্যা করে। অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। রাজ্জাক বলেন, কনস্টেবল এর চাকরি থেকে ধারাবাহিক ভাবে।লেখাপড়া করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে পুলিশের কর্মকর্তা হতে চাই।আমার জন্য সকলে দোয়া করবেন।