প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২১, ১৯:২৮
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের ভালকুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. ইব্রাহীম মন্ডল। উপজেলার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ শমসের ফকির ডিগ্রি কলেজে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন।এলাকার অধিকাংশ মানুষ তাকে কবুতর প্রেমী হিসেবেই চিনে।তার কবুতরের প্রতি মায়া মমতা দেখে মানুষ তার প্রতি খুবই খুশি।
কথায় আছে,শখের তোলা আশি টাকা।ইব্রাহীমকে দেখলেই সেটা বুঝা যায়।কখনোই কবুতর পালন করে লাভবান হবেন এ ধরনের কোনো চিন্তাই নেই তার। সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য একজন লোক রেখেছেন।মাস শেষে তার কোনো আয় না থাকলেও খুব খুশি তিনি। শখ তো পূরণ হচ্ছে তার। পশুপাখির সেবা করতে পারছেন এতেই তিনি খুশি। একজন মানুষ নিজের সন্তানের যত্ন যেভাবে নেয় ঠিক ইব্রাহীম কবুতরের যত্ন সেভাবেই নেন। শখের জন্য একজন মানুষ এতো ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন সেটা ইব্রাহীমকে না দেখলে বুঝাই যেত না।
আজ থেকে প্রায় ২৬ বছর আগে নিতান্তই শখের বসে কবুতর পালন শুরু করেন ইব্রাহীম। তিনি তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। নানার কাছ থেকে টাকা নিয়ে স্থানীয় গোবিন্দাসী হাট থেকে মাত্র ৪ জোড়া কবুতর কেনেন। সেই কবুতর আস্তে আস্তে সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মাঝপথে সেই কবুতরের ওপর শিয়াল এবং গুইসাপের চোখ পড়ে।ভেঙ্গে যায় তার স্বপ্ন।
ছাত্রাবস্থায় অতিরিক্ত কোন পয়সা ছিল না তার হাতে। তাই হঠাৎ করেই থেমে যায় শখের কবুতর পালন। কিন্তু সহজে থেমে যাওয়ার পাত্র নন ইব্রাহীম। বেশ কয়েক বছর বন্ধ রেখে ২০১৪ সালে নতুন করে নিজের বাড়ির পাশে খোলা জায়গায় ঢেউটিনের ছাউনিতে ২ জোড়া কবুতর দিয়ে গড়ে তোলেন বর্তমান কবুতর খামারটি। এখন তার শেডে শোভা পাচ্ছে প্রায় ২২০ জোড়া কবুতর।
সরেজমিনে তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ডেউটিন দিয়ে দুই সাইডে তৈরি কবুতরের ঘর। ভিতরে বসানো হয়েছে প্রায় হাজার খানেক কবুতরের খোপ। আকারে বড় বিদেশি কবুতরগুলোর জন্য রয়েছে আলাদা লোহার খাঁচা। নিচে দেয়া আছে খাবার ও স্বচ্ছ পানি।এ ছাড়া তার খামারে ছাগল,হাঁস-মুরগী এবং তিতিরপাখি দেখা গেছে।
কবুতরগুলো প্রয়োজন মতো যে যার মতো করে খাবার খাচ্ছে, আবার উড়ে গিয়ে বসছে নিজের কামরাতে। সেখানে বসে কোনোটা ডিমে তা দিচ্ছে। কোনোটা নিজের বাচ্চাকে খাইয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ অপরের সাথে হট্টগোলে ব্যস্ত। কেউ বা আবার দলবলে সাঁতার কাটছে।তার কবুতরের খামার দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষ বিকাল বেলা ভীড় জমাচ্ছে।কবুতর চাষের শুরুতে মাত্র ৮০০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেও এখন তার শখের কবুতর ফার্মে মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকা।
ইব্রাহীম জানান, ছোটবেলা থেকেই কবুতর পোষার স্বপ্ন ছিল প্রবল। উড়ন্ত কবুতর দেখতে খুব ভালো লাগত। তাই প্রাণিবিদ্যা বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করেছি যাতে পশুপাখিদের সঠিকভাবে লালন পালন করতে পারি। পড়াশোনা শেষ করে শখের বশে এ খামার গড়ে তুলেছি। খামারে প্রায় নানা প্রজাতির কবুতর রয়েছে। খামারে বর্তমানে কবুতরের সংখ্যা ৪৪০ ছাড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তিনি এসব কবুতর সংগ্রহ করেছি।কখনও বিনিময় পদ্ধতি অর্থাৎ, এক জাতের কবুতর দিয়ে অন্য জাতের নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে আমার সংগ্রহশালা বাড়িয়েছি।
তিনি আরও জানান, কোনো কারনে কবুতর মারা গেলে চোখে পানি এসে যায়।মনে হয় যেন আমার একজন সন্তান দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে।নিজের চাহিদা মেটানোর জন্য কখনও খামার থেকে ডিম বা কবুতর নেই না।ওরা ওদের মতো ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক এটাই আমার প্রত্যাশা।তবে তার এই খামার কোনো বাণিজ্যিক খামার নয়। এখান থেকে তিনি কোনো রোজগারের আশাও করেন না। এটা নিতান্তই তার শখের খামার। তার মতে, কেউ চাইলে বাণিজ্যিকভিত্তিতে এমন কবুতরের খামার করতে পারেন। এর মাধ্যমে মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।কিন্তু তিনি কখনও লাভের আশা করেন না।
প্রভাষক ইব্রাহীমের কাছ থেকে কবুতর ও পরামর্শ নিয়ে শখের কবুতর পালন করছেন স্থানীয় লিখন আহমেদ, রুবেল হাসান, সোনা মন্ডল,খোকন, নুরুল ইসলামসহ উপজেলার অনেকেই। তাদের শখের কবুতর চাষিদের ঘরে ঘরে এখন শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রংয়ের কিং,দামাসিন,বাশিরাজ ককা,এরাবিয়ান ককা,লোটন,লাল বোম্বাই,হলুদ বোম্বাই,চায়না খাকি,সিলভার চন্দন,সোয়া চন্দন জাতের কবুতর।
মাঝে মধ্যে তিনি সব কবুতর খোপ থেকে বের করে উড়িয়ে দেন। কবুতর যখন এক সঙ্গে আকাশে ওড়ে, কোনো কোনোটি ডিগবাজি দেয় তখন তিনি কবুতর পোষার স্বার্থকতা ও আনন্দ খুঁজে পান। দৃষ্টিনন্দন এ দৃশ্য দেখে তার প্রাণ ভরে যায়। প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৫টায় উঠে তিনি কবুতর পরিচর্যায় হাত দেন, আর একটানা সকাল ৯ টা অবধি চলে এ কাজ। এ কাজে স্ত্রী ও সাড়ে ৭ বছরের মেয়ে তাকে নানাভাবে সাহায্য করেন। এ ছাড়া এখন সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য একজন লোক রেখেছেন।
তার স্ত্রী সালমা জাহান জানান, খামারের কবুতরদের নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। এই খামার তার ধ্যান-জ্ঞান। অবসরের পুরোটা সময় তার স্বামী এ খামারে ব্যয় করেন। ছোটবেলা থেকে তিনি কবুতর পালন করে আসছেন। এজন্য অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের কাছে গালমন্দও শুনতে হয়েছে তাকে।
তার প্রতিবেশি সাধন দাস বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই ইব্রাহীমকে কবুতর পালন করতে দেখেছি।ওর কবুতরের লালনপালনের অদম্য ইচ্ছা দেখে আমরা অভিভূত। খামার দেখতে আসা শামস্উদ্দিন চয়ন জানান, ইব্রাহীমের কবুতরের খামারের কথা লোকেমুখে শুনেছি।বাস্তবে দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো।তিনি সত্যিকার অর্থে একজন কবুতর প্রেমী। তার কবুতরের খামার দেখে আমি নিজেও সিদ্ধান্ত নিয়েছি শখের বশে কবুতর পালন করবো।