প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২১, ৩:৪৫
দুই বছর তিন মাস আগে স্থানীয় ছাঁতড়া বাজার থেকে ৬২হাজার টাকা দিয়ে পাকিস্তানি সিংড়ি জাতের ষাঁড় গরু কিনেন। কেনার পর লালন-পালন করে গরুটি কুরবানীর ঈদ উপলক্ষে বিক্রির প্রস্তুতি নিয়েছেন। বেশ কয়েকজন ক্রেতা গরুটির দাম ১১লাখ টাকা পর্যন্ত দাম বলেছেন। তবে ১৫লাখ হলে বিক্রি করবেন বলে জানান গরুর মালিক রফিকুল ইসলাম।
সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দেয়া হয় কোরবানী। আর কিছুদিন পরেই সাড়া বিশ্বের মুসলিম জানের বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহায় কোরবানির পশুর চাহিদা বেড়ে যায় অনেকগুন। ঈদকে সামনে রেখে পশু বিক্রেতারা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন। দীর্ঘদিন স্বযত্নে লালন-পালন করে ভালো দাম দিয়ে গরু তুলে দেন ক্রেতাদের হাতে।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার নলঘোর গ্রামের রফিকুল ইসলাম। পেশায় একজন মিষ্টির দোকানী। মিষ্টি তৈরি করে স্থানীয় পীরপালি বাজারে বিক্রি করে থাকেন। মিষ্টি বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে গত দুই বছর ৩মাস আগে ( ২০১৯) স্থানীয় ছাঁতড়া গরুর হাট থেকে একটি পাকিস্তানি সিংড়ি জাতের ষাঁড় গরু কিনেন ৬২হাজার টাকা দিয়ে।
ষাঁড় গরুটি কিনে বাড়িতে নিয়ে আসার পর রফিকুলের মেয়ে রিমা খাতুন নাম দেয় বাদশা। সেই ষাঁড় গরুটি লালন-পালন করে মোটা তাজা করে বিক্রির উপযোগী করেছেন।
বর্তমানে প্রায় ২২মন ওজনের ষাঁড় গরুটি লম্বায় ৯ ফুট ১০ ইঞ্চি, উচ্চতায় ৭ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং রং টকটকে লাল। রফিকুলের বিশাল আকৃতির বাদশা নামের ষাঁড় গরুটি দেখতে প্রতিদিন ভীড় জমাচ্ছেন স্থানীয় অসংখ্য মানুষ। আসছেন গরু কেনার জন্য দূর-দূরান্ত ক্রেতাররাও।
স্থানীয় বাসিন্দা সাহাজুল ইসলাম বলেন, এত বড় ষাঁড় গরু হামি কোনদিন সামনা সামনি দেকিনি। রফিকুল ভাই ২বছর আগে গরুডা কিনা লালন পালন করা বড় করা তুলিছে। সামনে ঈদ তাই বেচার চেষ্টা করিচ্ছে। ভালো দাম পালে বেচবে।
আবুল হোসেন নামের পাশ্ববর্তী পীরপালি গ্রামের বাসিন্দা বলেন, হামরা একই এলাকার লোক। রফিকুল ভাইয়ের মিষ্টির দোকান আছে পীরপালি বাজারোত, তাই মেলা আগে থ্যাকা হামার তার সাথে খাতির। ২বছর আগে গরুডা কিনা মোটাতাজা করিছে। ঈদোত বেচবে। তার মেয়ে নাম দিছে বাদশা। এত বড় গরু হামি এর আগে কুন্টি দেকিনি।
গরুডা লালন পালন করা বড় করা তুলতে তার মেলা টেকা খরচ হচে। মেলা জাগাত থাকা গরুডা কিনবার লোক আছিচ্ছে। ১১লাখ পর্যন্ত দাম উঠিছে। তয় আর আনা বেশি দাম হলে বেচবে। গরুডা দেখতে মেল্যা বড়। তয় এই গরু যারা বড়লোক মানুষ তারা ভালো দামে কিনা লিবে। সবার সামর্থ্য হবেনা এত দাম দিয়া কিনার।
আসাদ হোসেন নামের এক ক্রেতা এসেছেন রফিকুল ইসলামের বাদশা নামের ষাঁড় গরুটি কেনার জন্য এসময় কথা হয় তার সাথে, তিনি বলেন, আমরা ৭জন মিলে কুরবানীর গরু কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঈদের আর অল্প কিছুদিন সময় আছে। তবে একটু আগেই গরু কিনে বাসায় রেখে পরিচর্চা করে কুরবানী দিতে চাই। গরুটি দেখতে অনেক সুন্দর ও মোটাতাজা। যারা সখ করে একটু বড় মাপের গরু কুরবানী দিতে চায় তারাই মূলত এ ধরনের বড় উচ্চতার ষাঁড় গরু কুরবানী দিয়ে থাকে।
তিনি আরো বলেন, ষাঁড় গরুটির মালিক ১৫লাখ টাকা দাম চেয়েছে। তবে এই গরুটির ওজন হবে প্রায় ২০-থেকে ২২মনের মতো। বাজারে মাংশের কেজি প্রতি দাম হিসেব করলে ষাঁড় গরুর দাম এতবেশি হবেনা। যেহেতু কুরবানীর জন্য পুরো গরু কিনতে হয়। আর অনেকে গরুর উচ্চতা, ওজন এবং গঠন আকৃতি দেখে গরু কিনে থাকেন যার কারনে গরুর দাম একটু বেশি দিয়ে কিনতে হয়।
রফিকুলের এই ষাঁড় গরুটির দাম আমরা ১১লাখ টাকা পর্যন্ত বলেছি। তিনি ১৫লাখ টাকা দাম বলেছেন। তারপর দু”এক দিন তাকে ভাবার সময় দিয়েছ যদি একটু কমবেশি করে দাম বলে তবে আমরা গরুটি কিনবো।
রফিকুল ইসলাম মিষ্টির দোকান নিয়ে ব্যস্থ থাকেন সারদিন আর তার স্ত্রী ছবিয়া বেগম সাংসারিক কাজে ব্যস্থ থাকার কারনে রফিকুল ইসলামের একমাত্র মেয়ে স্থানীয় শাহপকুড়িয়া বালিকা বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী রিমা খাতুন ষাঁড় গরুটিকে যতœ করেন।
যার কারনে রিমার বাদশা নামের ষাঁড় গরুটির প্রতি মায়া জন্মেছে। যার কারনে তার পছন্দের বাদশা বিক্রির করা হবে শুনে তার মনটা খুবই খারাপ। কিন্তু গরীব মানুষ একটু লাভের আশায় ষাঁড় গরুটি কিনে মোটা তাজা করে বিক্রির জন্য উপযোগী করা হয়েছে।
রিমা খাতুন এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আব্বু যখন ষাঁড় গরুটি কিনে এনেছিল তখন আমি নাম দিয়েছিলাম বাদশা। করোনার কারনে আমার স্কুল প্রায় ১৫মাস থেকে বন্ধ রয়েছে। যার কারনে বাড়িতেই থাকতে হয়। তাই বাদশাকে আমিই বেশি দেখাশোনা করি।
বাদশাকে গোসল করানো, খাবার দেয়া, গোয়াল ঘরে রাতে কয়েল দেয়া, অসুস্থ হলে ওষুধ খাওয়ানোসহ অনেক যত্ন করি। যখন ফ্রি থাকি তখনই বাদশার কাছে গিয়ে বসে থাকি। বাদশার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে সেও মাথা নারিয়ে তার মাথা আমার কোলে দেয়। বাদশা ক্ষুদা লাগলে বা অসুস্থ হলে আমি ঠিকই বুঝতে পারি।
রিমা বলেন, আমরা গরীব মানুষ তাই আব্বু বাদশাকে মিষ্টির দোকানের লাভের টাকা দিয়ে কিনেছেন। যাতে মোটা-তাজা করে বড় করে তুলে একটু বেশি দামে বিক্রি করা যায়। মনটা চাইছেনা বাদশাকে বিক্রি করে দিতে কিন্তু তবুওতো বিক্রি করতে হবে। তবে একটু ভালো দাম পেলে আব্বুকে বলেছি লাভের টাকা দিয়ে আরেকটি ষাঁড় গরু যেন কিনে দেয়। আবার ষাঁড় গরু কিনলে তার নামও দিবো বাদশা।
ষাঁড় গরুটির মালিক রফিকুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, অনেক কষ্ট করা হামার মিষ্টির দোকানের ১বছরের লাভের টেকা দিয়া ছাঁতড়া বাজারোত থ্যাকা ৬২হাজার দিয়া ষাঁড় গরুডা কিনিছি। গরুডা কিনা আনার পর হামার মেয়েডা নাম দিছিলো বাদশা। হামি আর হামার বউ কাজে ব্যস্থ থাকার কারনে মেয়েডাই বেশি যত্ন লিছে।
প্রায় ২বছর ৩মাস ধরা গরুডাক বড় করা তোলা হচে। মেলা ধরনের খাবার খিলান লাগিছে। ভাত,মাশ কালাই, মসুরের ছোলা, গুড়া, খৈল, মোটা ভূসি, আলু, ভুট্রা, কাঁচা ঘাস নিয়মিত খিলাছি। মাঝে মাঝে কলাও খিলাছি। দিন-রাত মিলা ৫-৬ বার খাবার দেওয়া লাগে। প্রতিদিন হামার বাদশার জনন্নি নানা রকম খাবার দেওয়া লাগিছে ৩৫০-৪০০টেকার খরচ করা লাগিছে বাদশার প্রতিদিন খাবার খরচ বাবদ ।
আর মাঝে মাঝে তো নানা ধরনের অসুখ হলে মেলা টেকা চলা যায় পশু ডাক্তারোক বাড়ি আনা চিকিৎসা করান লাগে। ওষুধ খরচ মেলা পড়া যায় যখন অসুখ হয় বাদশার। গরু হলে কি হবে তারও তো জীবন আছে। সব মিলা এ পর্যন্ত হামার প্রায় সাড়ে ৫লাখ থাকা ৬লাখের মত খরচ হছে বাদশার জন্নি। হামার মেয়েডার বাদশার জন্নি খুব মায়া জন্মা গেছে।
বেচার কথা শুনার মনডা খবুই খারাপ করা আছে। এখন কি আর করমু বেচা তো লাগবেই। তয় বাদশাক বেচার পর আবার লাভের টেকা দিয়া আবার একটা ষাঁড় গরু একটা কিনা দিমু।
রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই মেলা জাগাত থ্যাকা লোকজন আচিচ্ছে বাদশাক কিনার জন্নি। একন পর্যন্ত ১০ থাকা ১১লাখ পর্যন্ত দাম কছে। হামি ১৫লাখ দাম চাচ্ছি। তয় সবাই হামার বাদশাক তো কিনবে না। যারা বড়লোক মানুষ এ্যানা বড় দেকা মোটাতাজা গরু কিনবার চায় তারাই কিনবে। এখন দেকা যাক কি হয়। করোনার কারনে তো মেল্যা জাগাত থাকা মানুষ আসবার পারিচ্ছেনা।
মেলা জাগাত লকডাইন চলিচ্ছে। যদি লকডাউন না থাকলোনি হয়তো আরো মেলা মানুষ হামার বাদশাডাক আসা দেকা পছন্দ করা কিনবার পারলোনি। আবার শুনিচ্ছি গরুর হাট নাকি বন্ধ থাকপে লওগাঁর ডিসি স্যার নাকি ষোষনা দিছে। তালে বাদশাকতো হাটোতও লিয়্যা যাবার পারমুনা।
রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, "হামরা গরীব মানুষ এ্যানা দুডা টেকা বেশি লাভের জন্নি মেলা কষ্ট করা লালন পালন করা বড় করা তুলিছি। একন যদি কুরবানীর কারনে দাম ভালো পাই তয় এ্যানা লাভ করা পারমু। আর লাভের টেকা দিয়া সংসারের খরচ চালামু আর আরেকটা গরু কিনমু বলা ইচ্ছা আছে। যে করোনা আর লকডাউন শুরু হছে কি যে হবে কি বুঝবার পারিচ্ছিনা বা"।