
প্রকাশ: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৪:১৭

বরিশালসহ দক্ষিণা ঞ্চল নদীবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় যত্রতত্রভাবে বেড়ে চলছে ইটভাটার সংখ্যা। সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দূর্গম এলাকার নদীর চর ও তীরে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ইটভাটাগুলো অবৈধভাবে গড়ে তুলছে মৌসুমী ইট ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্ব সড়ক, বাসা-বাড়ী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে বিধিনিষেধ না মেনেই ফসলী জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠছে ইটভাটা। ফলে ভাটা থেকে নির্গত বিষক্ত ধোঁয়া বায়ূকে পর্যাপ্ত পরিমাণে দূষণ করছে। বায়ূ দূষনের পাশাপাশি কৃষিজমি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি করছে। কেননা মাটির উপরিভাগেই বেশি কৃষির উৎপাদন ক্ষমতা থাকে। কিন্তু ইটভাটাগুলো সেই মাটির উপরিভাগই কেটে নিয়েই ইট তৈরি করছে। ফলে দিনে দিনে কৃষির জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। একদিকে ফসলী জমি কমে যাওয়া অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া হতাশ কৃষক পরিবারগুলো। তাই ফসল উৎপাদনে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকেরা। ফলে সংসার চালাতে ইতোমধ্যে তারা ভিন্ন উপায় খুঁজে নিয়েছেন। তারা এখন জমিতে ফসল ফলানোর পরিবর্তে বিভিন্ন ইটভাটায় ফসলি জমির মাটি বিক্রি করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রেও প্রায়ই তাদের প্রতারণার শিকার হতে হচ্ছে। এটি পরিবেশকে আরো মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিভিন্ন উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, ইটভাটা এলাকা ও এর আশপাশের বেশির ভাগ ফসলি জমির মাটি পাঁচ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত গভীর করে কাটা হচ্ছে। এতে ওইসব এলাকার ফসলি জমি ডোবায় পরিণত হচ্ছে। যথাযথ আইনের প্রয়োগ না থাকায় মাটি ব্যবসায়ীরা এক শ্রেণির দালাল দিয়ে সাধারণ কৃষকদের লোভে ফেলে ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছেন। উৎপাদিত ফসলের দাম না পাওয়া ও নগদ টাকার লালসা দেখিয়ে খুব সহজেই কৃষকদের রাজি করিয়ে মাটি বিক্রি করতে সাহায্য করছেন। আর কালো টাকায় পকেট ভর্তি করছেন দালালচক্র। কিন্তু এভাবে মাটি বিক্রির ফলে উর্বরতা হারিয়ে কৃষি জমি চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে যাবে। তাছাড়া ফসলহানির আশঙ্কা তো রয়েছেই।
ইটভাটায় মাটি বিক্রি করেছেন এমন বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, ইটভাটায় মাটি সরবরাহের জন্য এক শ্রেণির দালাল গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের মাটি বিক্রি করতে উৎসাহ যোগায়। উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় অজুহাত দেখিয়ে সহজ-সরল কৃষকদের ম্যানেজ করে দালালরা ফসলি জমির মাটি স্বল্পমূল্যে কিনে ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে যে জমির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে তা অনেক কৃষকই জানেন না। আবার অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার ক্ষতি পোষাতে তাদের ফসলি জমি থেকে এক হাজার মাটি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। চাওড়া ইউনিয়নের ঘটখালী গ্রামের কৃষক মো. মহসিন হাওলাদার বলেন, প্রতিবছরই আবাদ করে ফসল ফলিয়ে লোকসান গুণতে হয়। বাজারে ধানের দাম থাকে না। তাই ইটভাটায় ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করছি।

বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় ৪৭৬ টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেয়েছে ৩৪৭ টি ইটভাটা। বাকি ১২৯ টি ইটভাটা পরিবেশ অধিপ্তরের ছাড়পত্র পায়নি। আর আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ৩৯০ টি এবং সম্পূন্ন অবৈধ রয়েছে ৮৬ টি ড্রাম চিমনি-(৮০-১২০ ফিট) ইটভাটা। জেলায় ১৭৮ টি ইটভাটা রয়েছে। য়ার মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ১০৮ টি, ছাড়পত্র পায়নি ৭০ টি। এর মধ্যে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ১৪৪ টি, সম্পূর্ণ অবৈধ রয়েছে ৩৪ টি ড্রাম চিমনি-(৮০-১২০ ফিট) ইটভাটা। পটুয়াখালী জেলায় ৭৩ টি ইটভাটা রয়েছে। য়ার মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৫২টি, ছাড়পত্র পায়নি ২১টি। এর মধ্যে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ৫৬ টি, অবৈধ রয়েছে ১৭ টি ড্রাম চিমনি-(৮০-১২০ ফিট) ইটভাটা। বরগুনা জেলায় ৫৬ টি ইটভাটা রয়েছে। যার মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৫২ টি, ছাড়পত্র পায়নি ৪ টি। এর মধ্যে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ৫৪ টি, অবৈধ রয়েছে ২ টি ড্রাম চিমনি-(৮০-১২০ ফিট) ইটভাটা। ভোলা জেলায় ৮৮ টি ইটভাটা রয়েছে। য়ার মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৬৭ টি, ছাড়পত্র পায়নি ২১ টি। এর মধ্যে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ৮৩ টি, অবৈধ রয়েছে ২ টি ড্রাম চিমনি-(৮০-১২০ ফিট) ইটভাটা। তবে শুধু ভোলায় ৩ টি হাইব্রীড হফম্যান কিলন অটো ব্রিকস রয়েছে। ঝালকাঠী জেলায় ৩৯ টি ইটভাটা রয়েছে। যার মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৩৪ টি, ছাড়পত্র পায়নি ৫ টি। এর মধ্যে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ১৯ টি, অবৈধ রয়েছে ২০ টি ড্রাম চিমনি-(৮০-১২০ ফিট) ইটভাটা। পিরোজপুর জেলায় ৪২ টি ইটভাটা রয়েছে। য়ার মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৩৪ টি, ছাড়পত্র পায়নি ৮ টি। এর মধ্যে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ৩১ টি, অবৈধ রয়েছে ১১ টি ড্রাম চিমনি-(৮০-১২০ ফিট) ইটভাটা। এছাড়াও বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় আরো দেড় থেকে দুইশত অবৈধ ইটভাটা রয়েছে বলে দাবী করছেন একাধিক ইটভাটা ব্যবসায়ীরা। তবে বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এসকল অবৈধ ইটভাটা বন্ধে বিভাগের বিভিন্ন জেলা উপজেলা ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেই সব অভিযানে লাখ লাখ কাঁচা ইট ধ্বংস করার পাশাপাশি ইটভাটা গুড়িয়ে দেয়া হলেও এক শ্রেনীর মুনাফালোভীরা কয়েকদিন যেতে না যেতেই পুনরায় নাম পরিবর্তন করে ইটভাটা চালু করছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলনযোগ্য জমির উৎপাদন শক্তি জমা থাকে মাটির ছয় থেকে ১৮ ইি গভীরতায়। মাটির এই অংশে যে কোনো ফসল বেড়ে ওঠার গুণাগুণ সুরক্ষিত থাকে। বীজ রোপণের পর এই অংশ থেকেই ফসল প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে বড় হয়। এটাকে টপ সয়েল বলে। এই টপ সয়েলসহ জমির মাটি একবার কেটে নিলে সে জমির আর প্রাণ থাকে না। ফলে পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ওই জমিতে কোনো ফসল উৎপাদিত হয় না। এতে জমিটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। জমির মাটি বিক্রি করলে জমির উৎপাদন শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক তাদের ফসলি জমির মাটি বিক্রি না করতে পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মোঃ আবদুল হালিম বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের চোখ আড়াল করে ইট উৎপাদনের সৃজনে মৌসুমী ইটভাটা ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে গড়ে তুলছে ১২০ ফুটের চিমটি, ড্রাম চিমটি এবং পাঁজার মতো ইটভাটা। কম বিনিয়োগে বেশি লাভবান হওয়ার জন্য সহজেই নদীর চরের মাটি কেটে ইট তৈরি করছে তাঁরা। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে যে কাঠ ব্যবহার করা হয়, এর জোগান দিতে অবাধে গাছ কেটে নিয়ে পোড়ানোর হচ্ছে। ফলে দিন দিন বনভূমি উঝারের পাশাপাশি ফসলি উর্বর জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত। তবে এসব অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তর। নিয়মিত অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভাটায় থাকা কাঁচা ইট পানিতে ভিজিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, পরিবেশের ভারসাম্যতা ফিরিয়ে আনার লক্ষে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটার তৈরির নতুন আইন বাস্তবায়নের জন্য ইটভাটার মালিকদের সাথে উপজেলা উপজেলায় গিয়ে মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। এছাড়াও অবৈধ ইটভাটার মালিকদের বার বার নোটিশ দেয়া হচ্ছে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা ব্যবহারের জন্য।

ইনিউজ ৭১/টি.টি. রাকিব