মুক্তিযুদ্ধ ও জাসদের সৃষ্টির ইতিহাস

আহমেদ ফজলুর রহমান মুরাদ,সিনিয়র লেখক ও কলামলিস্ট
প্রকাশিত: ১০:৫৩ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০
মুক্তিযুদ্ধ ও জাসদের সৃষ্টির ইতিহাস

বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ বাস্তবতায় রূপ পেল ’৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর। শত শত বছর ধরে পরাধীনতার গ্লানিতে একটি জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব প্রায় হারিয়ে যেতে যেতে প্রাণ ফিরে পেল ’৭১-এ। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে আদি ভারতীয়/হিন্দু সভ্যতার আড়ালে ঢেকে পড়া ‘বাঙালি সভ্যতা’ও বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেল। প্রশস্ত হলো বাঙালির ‘তৃতীয় জাগরণে’র পথ। বাঙালি, বাংলাদেশ ও ‘বাঙালি সভ্যতা’ এখন নিজস্ব সত্তা নিয়ে এগিয়ে চলছে সামনে বিশ্ব সমাজের লক্ষ্যে। নিঃসন্দেহে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

কিন্তু কী করে এই অসাধারণ ঘটনার বাস্তবায়ন সম্ভব হলো? প্রতিপক্ষের ভুলে বা দুর্বলতায়? কারো বদান্যতা বা কূটচালের কারণে? কারো একটি ভাষণে বা কারো বেতার ঘোষণায়? অন্যদিকে, স্বাধীনতো এলো কিন্তু এর গন্তব্য কোথায়? এটি আবার কালের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাবে না তো? - ইত্যাকার প্রশ্ন, সন্দেহ এবং আশংকা আমাদের আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে বৈকি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠকদের গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’এর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মূল বডি ‘নিউক্লিয়াস’এর তিন নায়ক ছিলেন- সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ স্বয়ং। ঘটনার আড়ালেও ঘটনা থাকে, যা সহজে কারো চোখে পড়ে না। যেমন ‘জয় বাংলা’ সহ স্বাধীনতার শ্লোগানমালা, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, স্বাধীনতার ইশতেহার, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ এর ডাক, প্রভৃতি সিদ্ধান্ত কে, কখন, কোথায়, কিভাবে নিয়েছিলেন এবং কি করে এসব কার্যকরী করা হয়েছিল? এসব বিষয়ে সকল বিভ্রান্তির অবসান এ প্রতিটি ঘটনার সাথে সরাসরি কারা জড়িত ছিলেন?? কিন্তু‘ বাস্তবে ‘নিউক্লিয়াস’ ও ‘বিএলএফ’ই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। ১৯৬২তে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, এবং ‘৬ দফা’ ও ‘১১ দফা’ আন্দোলন এবং ’৬৯এর ‘গণঅভ্যুত্থানে’র মূলে কারা বা কোন শক্তি এককভাবে আন্দোলন-সংগ্রামের পরিকল্পনাকারী ছিল? এতোদিন এসব প্রশ্নের উত্তর না খোঁজার কারণে ’৬২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত অগ্নিঝরা কর্মকান্ডের কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা না দিয়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস রচিত হয়েছে।
পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের মধ্যে সুস্পষ্ট দু’টি ধারা বিদ্যমান ছিল। একটি ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজস্ব রাজনীতির ধারা এবং অপর অংশের ঝোঁক ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতি। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নিজস্ব রাজনীতির ধারার তিনজন ছাত্রনেতা ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ গঠন করেন। তিন সদস্যের এই ক্ষুদ্র সত্তা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নিউক্লিয়াসের তিনজন সদস্য ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ। এরা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরের প্রগতিশীল অংশের মধ্যে থেকে প্রতিশ্রুতিশীল কর্মী সংগ্রহ করে সারাদেশে একটি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। নিউক্লিয়াসের কাজ ছিল, 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে যাবতীয় নীতি-কৌশল প্রনয়ণ করা এবং স্বাধীকার আন্দোলনকে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়া। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সর্বময় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা ছিল এই তিন ছাত্রনেতার কাছে। দেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত ছয় দফা, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের এগারো দফার আন্দোলনসহ প্রতিটি আন্দোলনকে গণরূপদানের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা। একইসাথে জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করা ছিল নিউক্লিয়াসের[৪] অন্যতম কাজ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি, ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন, জয়বাংলা বাহিনী গঠন এবং তার কুচকাওয়াজ ও বঙ্গবন্ধুকে সামরিক অভিবাদন জানানো, সবই ছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ। বিপ্লবী পরিষদের সকল কর্মকাণ্ডের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছিল।
নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তে ১৯৬৪ সালে কাজী আরেফ আহমেদের পৈত্রিক নিবাস পুরনো ঢাকার ১৪/৩ অভয় দাস লেনের বাড়িতে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন স্থাপন করা হয়। এ মেশিনে মূদ্রিত ‘জয়বাংলা’ ও ‘বিপ্লবী বাংলা’[৪] নামে স্বাধীনতার ইশতেহার[৪] প্রচার করা হতো। নির্দেশ ছিল যে এ ইশতেহার পড়ার পর পুড়িয়ে বা ছিঁড়ে ফেলতে হবে। নিউক্লিয়াস সদস্যদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাকের অন্যতম দায়িত্ব ছিলো শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে নিউক্লিয়াসের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত রাখা। কাজী আরেফের দায়িত্ব ছিলো স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সংগঠন গড়ে তোলা। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে বাষট্টি সালে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ছেষট্টির ছয় দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন , ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন, শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান, নিউক্লিয়াস'র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি, আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ সর্বোপরি বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধসহ এ সকল কর্মকাণ্ডই ছিলো 'নিউক্লিয়াস'[৫] বা 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদে[৫] র সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ। আর এ সকল কর্মসূচির পরিকল্পনা প্রণীত হতো নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নিউক্লিয়াসের সাংগঠনিক তত্ত্বাবধানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সাত হাজার (৭০০০)সদস্য সংগৃহীত হয়।
সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ '১৯৭১:

নিউক্লিয়াসের মুল লক্ষ্যই ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন থেকে এ দেশকে স্বাধীন করা। ষাটের দশকের শেষ থেকেই নিউক্লিয়াস মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর পুরোদমে প্রস্তুতি চলতে থাকে। জাতীয় পতাকা তৈরি, জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুকে সশস্ত্র অভিবাদন জানানোর জন্য জয়বাংলা বাহিনী গঠন, ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ইত্যাদি সবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও মহড়া। ১৯৬৯ -এর গণঅভ্যুত্থানের পর নিউক্লিয়াসের পক্ষ থেকে স্লোগান তোলা হয়, তুমি কে আমি কে - বাঙালি বাঙালি; পদ্মা মেঘনা যমুনা - তোমার আমার ঠিকানা। আবার ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর স্বাধীনতার পথ অনেকটাই খুলে যায়। এ সময়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমশি করছিলো। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য এনে বাঙালিদের নিধন করার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। নিউক্লিয়াসের সদস্যগণ এ সময়ে পুরোদমে যুদ্ধের জন্য জাতিকে প্রস্তুত করতে থাকে। যদিও অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকে এ প্রস্তুতি মোটেও কার্যকর নয়, কিন্তু মানসিকভাবে জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার কারণে ২৫ মার্চ রাতে এবং পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এ সময়ে নিউক্লিয়াসের পক্ষ থেকে স্লোগান তোলা হয়, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর - বাংলাদেশ স্বাধীন কর। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ কে বিএলএফ বা Bangladesh liberation front করা হয়। এই বিএলএফ মুজিব বাহিনী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক ছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। ভারতের কালসিতে "এইটটি লিডার্স"এর নেতৃত্ব পর্যায়ে ট্রেনিং গ্রহন করেন তিনি। পরবর্তীতে পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরে মুজিব বাহিনীর উপপ্রধান হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে গোটা বাংলাদেশকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করেছিল বিএলএফ। চারটি অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান ছিলেন, শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজূল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। কাজী আরেফ আহমেদ এই চার আঞ্চলিক প্রধানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব পালন করতেন। এ ছাড়াও তিনি বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং ছাত্রলীগের সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করতেন। বিএলএফ দেশের অভ্যন্তরে ২০ হাজার ছাত্র-যুবককে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে কাজী আরেফ আহমেদসহ নিউক্লিয়াসের সদস্যগণ ষাটের দশক থেকেই ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলন এবং বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনকে কৌশলে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছেন। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে এদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। তাই দেশে স্বাধীনের জন্য পর্দার অন্তরালের কুশিলব প্রকৃতপক্ষে নিউক্লিয়াসের সদস্যগণ।
জাসদের সৃষ্টি:-

পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের মধ্যে দু’টি ধারা বিদ্যমান ছিল। এক অংশের নেতৃত্ব দিতেন নিউক্লিয়াসের সদস্যগণ। এরা সবসময় কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদ নিজেদের পছন্দের ছাত্রনেতাদের নিয়ন্ত্রণের রাখার চেষ্টা করতেন। শুরু থেকে দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত এ প্রচেষ্টয় তাঁরা সফল হয়েছিলেন। এ অংশের নেতারা অনেক আগে থেকেই স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্লোগান বা বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের বর্ধিত সভায় তৎকালিন প্রচার সম্পাদক স্বপন কুমার চৌধুরী প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার । এদিন এ প্রশ্নে বর্ধিত সভা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এবং প্রস্তাবটি ৩৬-৯ ভোটে পাশ হয়।।
স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দলের সম্বন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রহমানের কাছে ১৫ দফা দাবি তোলে ছাত্রলীগের এ অংশের নেতারা। এ বিষয়ে সিরাজুল আলম খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর কয়েকবার কথাবার্তাও হয়। কিন্তু তেমন সারা পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে স্বাধীন দেশে ছাত্রলীগ প্রথম সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সে সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের বিভক্তি ঘটে। ২১, ২২ ও ২৩ জুলাই ১৯৭২ এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রলীগের তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক শাহাজাহান সিরাজের নেতৃত্বের অংশ পল্টন ময়দানে এবং সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বাংশ সম্মেলন আহবান করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। উভয় অংশই প্রধান অতিথি করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। অবশেষে বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সম্মেলনে যোগ দেন। এ থেকেই ছাত্রলীগ পৃথক হয়ে পড়ে। অবিভক্ত ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির আটজন সদস্য নূরে আলম সিদ্দিকীর পক্ষে এবং অবশিষ্ট ৩৬জন শাহজাহান সিরাজের পক্ষে অবস্থান নেয়। এ পরিস্থিতিতে শাহজাহান সিরাজের অংশের সাবেক ছাত্রনেতারা অনুধাবণ করেন যে, বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে না। এদিকে সে সময়ের বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অনেকের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ৩১ অক্টোবর ১৯৭২ গঠন করা হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ।
স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ ঘটা প্রথম রাজনৈতিক দল জাসদ। বিজয়ীর বেশে মুক্তিযুদ্ধ ফেরত এক ঝাঁক উদীয়মান ও তরুণ স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে গঠন করেন জাসদ। আত্মপ্রকাশকালে ৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সদস্যগণ ছিলেন, যুগ্মআহ্বায়ক: মেজর (অব.) এম এ জলিল ও আ স ম আব্দুর রব, সদস্য: শাহজাহান সিরাজ, বিধান কৃষ্ণ সেন, রহমত আলী, সুলতান উদ্দিন আহমেদ ও নুরে আলম জিকু। এই প্রক্রিয়ার পেছনে ছিলেন নিউক্লিয়াস সদস্য সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরেফ আহমেদ। নিউক্লিয়াসের অপর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক জাসদ গঠনের সকল প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত থাকলেও তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি যে, বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করা সম্ভব।
জাসদের মুল লক্ষ্য ছিল, শ্রেণীবৈষম্যহীন স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। যে স্বপ্ন বুকে ধারণ করে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন; সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে গঠন করা হয় জাসদ। কাজী আরেফ আহমেদ ছিলেন সেই স্বপ্নদ্রষ্টাদের মধ্যে প্রথম সারির একজন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সাহসিকতার সাথে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণআন্দোলন সংগঠিত ও পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন কাজী আরেফ আহমেদ। দলের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়, ‘আমরা লড়ছি শ্রেণিসংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে’। দলটির রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ গ্রহণ করা হয়।
১৯৭৩ সালে দেশের সাধারণ নির্বাচনে জাসদ অংশগ্রহণ করে। ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে জাসদ ২টি আসন লাভ করে। জাসদ গঠনের আগে থেকেই এ দল গঠনের সাথে সংশ্লিষ্টদের নিয়ন্ত্রণে গণকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। পরবর্তীতে কাজী আরেফ আহমেদ গণকণ্ঠ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এটি জাসদের দলীয় মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৭৮ সালে কাজী আরেফ আহমেদ জাসদের কৃষক সংগঠন জাতীয় কৃষক লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে তিনি জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা"বাকশাল" কায়েম করা হয়। জাসদ এ শাসন ব্যবস্থার বিরোধিতা করে। সরকার সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে জাসদকে গোপন সংগঠনের তৎপরতায় জড়িয়ে পড়তে হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাসদকে নতুনভাবে সমস্যায় পড়তে হয়। এসময়ে দলের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দেয়। নানা সময়ে দলের ভেতরে রাজনৈতিক বিতর্কের ফলে ১৯৮০, ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে মোট তিনদফায় জাসদ ভেঙ্গে যায়। এমন চড়াই-উৎড়াইয়ের পথে কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৮৬ সালে জাসদ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়ামের সদস্য নির্বাচিত হন। এসময়ে জাসদের কোন প্রেসিডেন্ট না থাকায় তিনি মুলত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৯ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি মৃতুর পুর্ব পর্যন্ত স্বপদে বহাল ছিলেন।।
কাজী আরেফ আহমেদ। ষাটের দশকে বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। রাজনৈতিক জীবনে ছিলেন একজন সৎ ও সজ্জ্বন ব্যক্তি।লক্ষে ছিলেন আপোষহীন ও অবিচল।ব্যক্তগত জীবনে তিনি সততার বিরল দৃষ্টান্ত।
হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে তাঁর সরব পদচারনা শুরু।ছয় দফার আন্দোলন থেকে উনসত্তরের গনঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের অনিবার্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে সাড়ে চার দশক থেকে জাতীয় রাজনীতির গতি প্রবাহের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের যোদ্ধা,সংগ্রামী চেতনার এক অগ্রসৈনিক।ষাটের দশকের গোড়াতেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষে গড়ে তোলা হয় গোপন সংগঠন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ। যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস হিসাবে সর্বজনবিদিত। কাজী আরেফ ছিলেন এই নিউক্লিয়াসের তিন সদস্যের একজন। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রুপকারদের একজন ছিলেন।জাতীয় সংগীত নির্ধারণেও রেখেছিলেন অগ্রণী ভূমিকা।মহান মুক্তিযুদ্ধকালে কাজী আরেফ আহমেদ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বি এলএফ) বা মুজিব বাহিনীর প্রধান।
কাজী আরেফ ছিলেন জাসদ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।জিয়ার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গনতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের তাত্বিক প্রবক্তা। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন ১০দলীয় ঐক্যমোর্চা। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গনআন্দোলনের অন্যতম সেনানী।

১৯৯৯ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কালিদাসপুরে সন্ত্রাস বিরোধী এক জনসভার মঞ্চে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ।
জাসদ গঠন এবং জাসদের রাজনীতি সম্পর্কে কাজী আরেফ আহমেদ বলেন, আমরা স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর সাথে থাকতে পারি নাই। ১৯৭২ সালের মে মাস থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে বিরোধ শুরু হয়। এর পরিণতি হিসেবে আমরা ৩১শে অক্টোবর জাসদ গঠন করি। আমরা আন্দোলন করার চেষ্টা করেছি। সেক্ষেত্রে আমাদের ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। আমরা ১৯৭১ সালে যেজন্য যুদ্ধ করেছিলাম, যেজন্য জনগণ যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়েছিল, সেই যুদ্ধ একটি মানচিত্র বা একটি পতাকা পাওয়ার জন্য ছিল না। জনগণের মুক্তিই ছিল সবচেয়ে বড় কথা। এই মুক্তি অর্থনৈতিক মুক্তি, ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রীয় মুক্তি। এই মুক্তির মধ্যে সবকিছুই জড়িত ছিল। এই মুক্তি শুধুমাত্র স্বাধীন দেশের সীমানা নির্ধারণের মুক্তি ছিল না। আমরা যদি শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে না পারি, আমরা যদি গণতান্ত্রিক ও অসম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে না পারি তাহলে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো ধরে রাখা যাবে না। আমরা তো পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি আরেকটি ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। আমরা অসম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। সমাজ এবং রাষ্ট্রীয়জীবন সবক্ষেত্রেই তেমনটি চেয়েছি। সেইসব বিষয় যখন আমরা দেখতে পেলাম না, সেসব বাস্তবায়নের যখন কোন লক্ষণ দেখলাম না, তখন আমরা বিরোধিতা করেছি। আমরা বিরোধিতা করেছি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করিনি। আমরা কখনই চাইনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা বা বঙ্গবন্ধুকে কেউ মেরে ফেলুক। আমরা চাইনি বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যা অত্যন্ত দুঃখজনক, বেদনাদায়ক, জঘন্য ঘটনা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে যদি আমরা বিপ্লব মনে করি তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড হল প্রতিবিপ্লব। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে চাওয়া-পাওয়াগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে মিনিপাকিস্তান সৃষ্টির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করা হয়েছিল।’।

ইনিউজ ৭১/টি.টি. রাকিব

সর্বাধিক পঠিত

Enews71.com is one of the popular bangla news portals. It has begun with commitment of fearless, investigative, informative and independent journalism. This online portal has started to provide real time news updates with maximum use of modern technology from 2014. Latest & breaking news of home and abroad, entertainment, lifestyle, special reports, politics, economics, culture, education, information technology, health, sports, columns and features are included in it. A genius team of Enews71 News has been built with a group of country's energetic young journalists. We are trying to build a bridge with Bengalis around the world and adding a new dimension to online news portal. The home of materialistic news.

সম্পাদক: শওকত হায়দার
© ২০১৯ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ইনিউজ৭১.কম
হাউজ: ৪০৮,রোড-৬, ডিওএইচএস - মিরপুর, ঢাকা-১২১৬

enewsltd@gmail.com