সাহেদ গাড়িচাপা দেওয়াতেন পথচারীকে,চালকে দিতেন ৮০০০ টাকা

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১:৫০ পিএম, ১৩ জুলাই ২০২০
সাহেদ গাড়িচাপা দেওয়াতেন পথচারীকে,চালকে দিতেন ৮০০০ টাকা

সাহেদ করিম ওরফে মো. সাহেদ ওরফে শহীদ। প্রতারণার জাদুকর। তার প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক ব্যক্তি পথে বসলেও কখনোই থেমে ছিলেন না তিনি। বরং একের পর এক নিপুণ শৈলীর প্রতারণা করে তা উৎরে গেছেন অবলীলায়। বাগিয়ে নিয়েছিলেন ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের তকমা। এরপর থেকে দিন দিন বেড়েই চলছিল তার ক্ষমতার দাপট।  

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অতীতে ছোট ছোট প্রতারণা করলেও শাহ সিমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে প্রতারণা দিয়েই প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানির সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক প্রতারণা শুরু। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে শাহ সিমেন্ট কোম্পানির কাছ থেকে সাত হাজার বস্তা সিমেন্ট বাকিতে নিয়েছিলেন মো. সাহেদ। শাহ সিমেন্ট কর্তৃপক্ষকে তার দেওয়া সেই ব্যাংক চেক বাউন্স করেছিল। হাজার হোক সাবেক সেনা কর্মকর্তা! তাই তার বিরুদ্ধে শুরুতে মামলায়ও যায়নি শাহ সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ। ঠিক কিছুদিন পরই ট্রান্সকম লিমিটেডের সঙ্গে এসি কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাহেদকে কাফরুল থানায় গ্রেফতার করার খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হয় শাহ সিমেন্ট কর্তৃপক্ষসহ আরও ছোট-বড় ২৫টি কোম্পানির প্রতিনিধি। 

সবার সঙ্গেই সাহেদ প্রধানমন্ত্রীর এডিসি, সাবেক সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন। তবে তাদের কেউই ওই বিষয়টি যাচাই-বাছাই না করার কারণে বহাল তবিয়তেই রয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ডানা মেলছিল তার প্রতারণার পাখার। তবে ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও প্রতারণার পাখা ডানা মেলে সাহেদের। পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক প্রতারণায় বহু মানুষকে পথে বসিয়েও বাগিয়ে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পদ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় একটি পাঁচ তারকা হোটেলের বিপরীতে একটি টেলিভিশনের একজন গণমাধ্যম কর্মী প্রথমে সাহেদকে ব্রেক দেন। পরবর্তীতে আরও দুইজন গণমাধ্যম কর্মী সাহেদকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক নামের নতুন তকমা দিয়ে ঘনঘন টিভি পর্দায় নিয়ে আসেন। সাহেদ হয়ে উঠেন একজন টিভি ব্যক্তিত্ব। প্রায় একই সময় সাহেদ সাবেক সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে ‘বিডি ক্লিক ওয়ান’ নামে একটি এমএলএম কোম্পানি খুলে হাতিয়ে নেন গ্রাহকদের অন্তত পাঁচ শত কোটি টাকা। কিছুদিন গা ঢাকা দিলেও যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন তার সেই মিডিয়ার পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে।

একপর্যায়ে তাদেরই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী প্রখ্যাত-বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে সেলফি উঠিয়ে নিজের বলয় বাড়াতে থাকেন সাহেদ। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুইজন শীর্ষ ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার পর সাহেদ তার দুষ্টু পরিকল্পনার অনেকটাই অর্জন করে বসেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মাধ্যমেই তার পরিচয় হয় সাবেক এক কূটনীতিকের সঙ্গে। নিজের অতীত অপকর্ম আড়াল করে তার বদৌলতেই বাগিয়ে নেন ২০১৬-১৯ মেয়াদের আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পদ। একদিকে টকশো ব্যক্তিত্ব অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। সাহেদকে আর ঠেকায় কে!

পুলিশ ও র‌্যাবের তদন্ত সূত্র জানায়, হাজার কোটি টাকার প্রতারণা ও জালিয়াতিতে অভিযুক্ত সাহেদের কবল থেকে দরিদ্র রিকশাচালকরাও রেহাই পায়নি। সাহেদের কার্যালয়ে প্রায় ৫০০ রিকশার লাইসেন্স পাওয়া যায়। তুরাগের হরিরামপুর ইউনিটের চেয়ারম্যান ও সচিব স্বাক্ষরিত লাইসেন্সগুলো সাহেদের নামে ইস্যু করা। উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় চলা রিকশার জন্য এই লাইসেন্স দিতেন সাহেদ। এ জন্য রিকশাচালকদের কাছ থেকে প্রথমেই দুই হাজার টাকা এবং প্রতি মাসে ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিতেন সাহেদ। কেউ টাকা না দিলে ভয় দেখাতেন, নির্যাতনও করতেন।

এদিকে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন কো-অর্ডিনেটর আবদুল্লাহ আল মুকিত বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নামের মিল থাকায় বিতর্কিত একটি হাসপাতালের সঙ্গে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সম্পৃক্ততা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। হাবিব গ্রুপ চট্টগ্রামভিত্তিক একটি স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যা ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সঙ্গে রিজেন্ট হাসপাতাল বা রিজেন্ট গ্রুপের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

সূত্র জানায়, রিজেন্ট হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরিচিতি দিতে গিয়ে সাহেদ রিজেন্ট এয়ারওয়েজকে নিজের প্রতিষ্ঠান বলে প্রচার করতেন। আবার কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইমামের ডেইল এলাকায় চট্টগ্রামের রিজেন্ট গ্রুপের সাইনবোর্ড লাগানো কিছু জমি রয়েছে। সেই জমির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নিজের ফেসবুক পেজে আপলোড করে তা নিজের দাবি করেন। বাস্তবে তা চট্টগ্রামের রিজেন্ট গ্রুপের মালিক সাবেক রাষ্ট্রদূত চট্টগ্রামের গোলাম আকবর খন্দকারের।গাড়িচাপা দিয়ে হাসপাতালে নিতেন সাহেদ, এক রোগী নিলেই চালক পেত ৮০০০

রাজধানীর উত্তরা এলাকায় কয়েকজন গাড়িচালকের সঙ্গে চুক্তি ছিল সাহেদের। তারা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পথচারীকে চাপা দিয়ে রোগী বানিয়ে গাড়িতে করে তাঁর হাসপাতালে রেখে চলে যেত। এভাবে একজন রোগী রেখে দিতে পারলে তাকে দেওয়া হতো আট হাজার টাকা করে। আর অচেতন অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালের আইসিইউতে ঢুকিয়ে তাঁর স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করতেন সাহেদ। কয়েকজন ভুক্তভোগী পুলিশ ও র‌্যাবের তদন্তকারীর কাছে এ ভয়ংকর অভিযোগ করেছেন।

তাঁরা বলছেন, কয়েকজন চালককে টাকার লোভ দেখিয়ে সাহেদ এই  ভয়ংকর অপকর্ম চালাচ্ছিলেন। তাঁর হয়ে রিজেন্ট হাসপাতালে জনসংযোগ কর্মকর্তা তারেক শিবলী এ লেনদেন করতেন। আইসিইউয়ের প্রয়োজন নেই সামান্য আহত এমন কয়েকজন রোগীকে দ্রুত আইসিইউতে নিয়ে আটকে রেখে তাঁদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা আদায় করায় স্বজনরা সন্দেহ করেন। পরে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী এবং হাসপাতালে বহন করে নিয়ে যাওয়া চালকদের সঙ্গে রিজেন্ট হাসপাতালে যোগাযোগের তথ্য পান ভুক্তভোগীরা। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।  


সর্বাধিক পঠিত

Enews71.com is one of the popular bangla news portals. It has begun with commitment of fearless, investigative, informative and independent journalism. This online portal has started to provide real time news updates with maximum use of modern technology from 2014. Latest & breaking news of home and abroad, entertainment, lifestyle, special reports, politics, economics, culture, education, information technology, health, sports, columns and features are included in it. A genius team of Enews71 News has been built with a group of country's energetic young journalists. We are trying to build a bridge with Bengalis around the world and adding a new dimension to online news portal. The home of materialistic news.

সম্পাদক: মোঃ শওকত হায়দার
© ২০১৯ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ইনিউজ৭১.কম
হাউজ: নাম্বার ৫ , পোস্ট অফিস রোড , পল্লবী , মিরপুর , ঢাকা - ১২১৬ ।
সম্পাদক +৮৮০১৯৪১৯৯৯৬৬৬
enewsltd@gmail.com