সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়টা এখন অনেকটা দূরুহ ব্যাপার হয়ে উঠছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশেষ প্রতিনিধি, জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: বুধবার ১৩ই জানুয়ারী ২০২১ ০৩:৪৪ অপরাহ্ন
সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়টা এখন অনেকটা দূরুহ ব্যাপার হয়ে উঠছে

“সম্পর্ক “ নামের ছোট্ট এই শব্দটির যেমন রয়েছে হাজারো অর্থ তেমন এর গুরুত্ব অনেক বেশি । সম্পর্ক বলতে বুঝায় টান,ভালোবাসা,আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা তথা মায়ার বাঁধনে একে অপরের পরিপূরক হওয়া। সম্পর্ক শব্দটি আমাদের জীবনে পথ চলার


একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিনত হয়েছে। প্রথমেই আমাদের জীবনের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত মা- বাবা,ভাই- বোন অর্থাৎ পারিবারিক এক বন্ধন যেখানে এক আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠে। রক্তের বন্ধনে বাঁধা এ সম্পর্ক। এরপরে নিকট


আত্মীয়,বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তার সম্পর্ক। এর বাইরেও জীবন চলার পথে এমন কিছু সম্পর্কের বন্ধনে আমরা আবদ্ধ হই যে সম্পর্ক রক্ত সম্পর্কীয় আত্নীয়তার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এর বাইরেও তো সম্পর্ক আছে যেমন বন্ধুত্বের সম্পর্ক, কোন দিক


থেকে এ সম্পর্ককে ছেট করে দেখার সুযোগ নেই। খেলার সাথী, সহপাঠী, কলিগ,ব্যবসায়িক পার্টনার যে কোন ভাবেই এ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। বলতে গেলে বন্ধুত্বের সম্পর্কের চেয়ে মধুর সম্পর্ক আর দ্বিতীয়টি নেই।তবে প্রত্যকটি সম্পর্কই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান।


বাবা মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কঃ

বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের সুসম্পর্ক নিয়ে কুরআন এবং হাদিসে অনেক নির্দেশ ও নসিহত রয়েছে। কুরআনের এসব নির্দেশ ও হাদিসের নসিহত সন্তানের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।তাওহিদের দায়িত্ব পালনের পরপরই বাবা-মার খেদমতের আহ্বান করা হয়েছে


কুরআনে।পবিত্র কোরআানে আল্লাহ তায়ালা বলেন-তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং বাবা-মার সাথে উত্তম ব্যবহার কর।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৩)। সুসম্পর্ক বজায় না রাখার কুপরিণতি সম্পর্কে


হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সে ক্ষতিগ্রস্ত হোক! সে ক্ষতিগ্রস্ত হোক! সে ক্ষতিগ্রস্ত হোক!সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, কে সেই ব্যক্তি? হে আল্লাহর রাসুল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া


সাল্লাম।তিনি উত্তরে বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতামাতা উভয়কে কিংবা তাদের একজনকে তাদের জীবদ্দশায় পেয়েছিলো কিন্তু (পিতামাতার খেদমত করে) জান্নাত অর্জন করতে পারলো না।’ (মুসলিম)।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কঃ

স্বামী স্ত্রী এর সম্পর্ক একটি মধুর সম্পর্ক।আল্লাহ এবং রাসূল (সাঃ) এর পরে একজন স্ত্রী এর কাছে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার পাএ তার স্বামী। ইসলাম আল্লাহর মনোনীত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তাই ইসলামে যেভাবে নারীর অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে, ঠিক


তেমনি স্থান পেয়েছে স্বামীর অধিকারও।স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কতটা গাঢ় তার প্রমাণ কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা তা ঘোষণা করেন-‘তারা তোমাদের পোশাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোশাকস্বরূপ।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)।রাসুলুল্লাহ


সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘উত্তম স্ত্রী হলো (সে-ই, যে) যখন তুমি তার দিকে তাকাও তখন সে তোমাকে আনন্দিত করে। যখন তাকে আদেশ কর তখন সে আনুগত্য করে আর যখন তুমি স্থানান্তরে যাও তখন সে তার ইজ্জত-আব্রু রক্ষা করে এবং সম্পদ হেফাযত করে।মনে রাখা উচিত বন্ধুত্ব হলো সমাজ জীবনের সুসম্পর্কের


চূড়ান্ত পর্যায়। বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করাও অনেক মর্যাদার। বন্ধুত্ব ও সৎ সঙ্গীদের মর্যাদা গ্রহণ করা এবং বন্ধুত্ব রক্ষার বিষয়ে কুরআন এবং হাদিসে অনেক গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।

আত্মীয়তার সম্পর্কঃ

ইসলাম আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। ইসলামের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর প্রতি কঠিন শাস্তি ও আজাবের কথা ঘোষণা করেছে।আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের নিন্দা করেছেন এবং


তারা মহান রবের অভিসম্পাতপ্রাপ্ত হবে বলে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর (ইবাদত করার) দেওয়া প্রতিশ্রুতির পর তা লঙ্ঘন করে, আর (আত্মীয়তার) সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। আর আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস। ’


-সূরা আর রাদ: ২৫হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের আমল (সপ্তাহের) প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত জুমার রাতে আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। কিন্তু আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর কোনো আমল কবুল করা হয় না। ’ -আহমাদ: ২/৪৮৪

বন্ধুত্বের  সম্পর্কঃ

না জেনে কাউকে যেমন বন্ধু রূপে গ্রহণ করা যায় না। তেমনি সত্যবাদী, নামাজি, দ্বীনদার ও পরোপকারী ব্যক্তিকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করারও কোনো উপায় নেই।বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতাবন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ নিয়ে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধু স্বভাবী হয়, তাই তাকে লক্ষ্য


করা উচিত, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (তিরমিজি) বন্ধু নির্বাচনের দিকনির্দেশনাকুরআনে বন্ধু নির্বাচনের দিকনির্দেশনায় আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে


তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে অবচেতন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।’ (সুরা কাহাফ : আয়াত ২৮)


কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় হলো  প্রত্যেকটি সম্পর্ক আজ নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, সন্মান,দায়িত্ববোধ নেই বললেই চলে। যৌথ পরিবার বলুন আর একক পরিবার বলুন সব পরিবারে আজ সম্পর্ক নামের বস্তুটিতে চির ধরেছে।


অবিশ্বাস, সন্দেহ, ইগো বিভিন্ন কারনে সম্পর্ক গুলো  টিকে থাকা মুশকিল।কেউ কাউকে যেন ছাড় দিতে চাচ্ছে না।  অথচ সম্পর্কের গুরুত্ব গুলো যদি আমরা অনুধাবন করতে পারতাম তাহলে হয়তো আজকের এই পরিনিতি দেখতে হতোনা। আজকে বন্ধুত্বের সরলতাকে পূজি বানিয়ে হত্যা, ধর্ষনের মত ঘটনা ঘটছ


ঘটছে অহরহ, ভাইয়ে -ভাইয়ে কলহ, স্বামী – স্ত্রী ডিভোর্স প্রবনতা বৃদ্ধি, মা বাবার সাথে সন্তানের দূরত্ব  সব কিছুই ঘটছে সম্পর্কের প্রতি উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা  ও অসন্মানের কারনে।  তাই  আমাদের সকলের উচিত সম্পর্কের গুরুত্বের কথা বিবেচনা  করে এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দ্বায়িত্ব শীল হওয়া।